মও.ভাসানীকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে গৃহব*ন্দি করে রেখেছিল
আজ মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ - ১৭ নভেম্বর ১৯৭৬) জন্মদিন উপলক্ষে ওনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা!
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি বলেন
"পিন্ডির গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করেছি দিল্লির দাসত্ব করার জন্যে নয়।"
-মাওলানা ভাসানী
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী এক চরিত্র আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ভাসান চরে নির্বাসিত থাকার কারণে তাকে মৌলানা ভাসানী বলে ডাকেন।
শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয়, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে এ অঞ্চলে সারাজীবন মওলানা ভাসানী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন।
মওলানা ভাসানী ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পাকিস্তান শাসনামলেও ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশ জনপ্রিয় ছিল।
কিন্তু এক সময় ভাসানীকে ডিঙিয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নেন শেখ মুজিবুর রহমান।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রভাবশালী নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন, কেন মুক্তিযোদ্ধের সময় ওনার কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান ছিল না?
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশেই ছিলেন। তখন তিনি টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন। তবে তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে নিজ বাড়িতে ছিলেন না।
নিজ বাড়ি ছেড়ে সেসময় তিনি উঠেছিলেন টাঙ্গাইলের বিন্যাফৈর নামের আরেকটি গ্রামে তার এক অনুসারীর বাড়িতে
এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করতে টাঙ্গাইলে গিয়েছিলেন দুইজন বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেনন এবং হায়দার আকবর খান রনো
মি. রনো তার 'শতাব্দী পেরিয়ে' বইয়ে লিখেছেন, তাদের পক্ষ থেকে মওলানা ভাসানীকে ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হলেও তিনি সেটি গ্রহণ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন টাঙ্গাইলে থেকে চীনের সাথে যোগাযোগ করতে - ততক্ষণে টাঙ্গাইলে পাকিস্তানী বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে এবং টাঙ্গাইল শহর দখল করে তারা গ্রামের দিকে এগুচ্ছিল
হায়দার আকবর খান রনো লিখেছেন, “আমি বললাম, চীনের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবেন? চীন দূতাবাসের পক্ষেও আপনার সাথে দেখা করতে এখানে আসা সম্ভব নয়, পথে তো যুদ্ধ হচ্ছে?
মওলানা সাহেব তারপরেও বললেন – হবে, যোগাযোগ হবে, সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। বুঝলাম, তিনি অযৌক্তিক কথা বলছেন।
পাকিস্তানী বাহিনী টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
এরপর তারা বিন্যাফৈর গ্রামের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে মওলানা ভাসানী কৃষকের বেশে ওই গ্রাম ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিরাজগঞ্জ যান
সেখানে একজন বামপন্থী নেতা সাইফুল ইসলামকে সাথে নিয়ে মওলানা ভাসানী আসাম দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।
ছবি যখন শেখ মুজিবুর রহমান জননেতা মওলানা ভাসানীর সাথে সাথে রাজনীতি করতেনভারতের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে মওলানা ভাসানী এবং তার সহচরদের কয়েকদিন সময় লেগে যায়।
তবে ভাসানী প্রথমে ভারতে ঢুকতে পারছিলেন না।
কারণ, সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বিষয়টি নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কাউকে সে এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়ার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ নিষেধ করেছে।
( নোট: তখন থেকে ভারত আওয়ামীলীগ কে সুবিধা দিত কারণ তারা আওয়ামীলীগ কে দিয়ে দেশের বিরুদ্ধে, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করাতে পারত)
পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও গবেষক সৌমিত্র দস্তিদার বলেন "মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মওলানা ভাসানী ভারত যেতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন লন্ডন যেতে।"।
মৌলানা ভাসানী ভারতে থাকাকালীন ভারত এবং তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই তার কোন খোঁজ-খবর জানতেন না।
তার মতো একজন সুপরিচিত এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ কেন হঠাৎ লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন - তা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল ভারতের তৎকালীন রাজনীতিবিদদের মধ্যে।
রাজনৈতিক মহলে অনেকে জানতেন যে মওলানা ভাসানী ভারতে আছেন। তবে তিনি ঠিক কোথায় আছেন এবং কীভাবে আছেন সেটি ছিল অনেকের অজানা।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু এবং অস্থায়ী সরকার গঠন করা হলেও মওলানা ভাসানী ছিলেন যুদ্ধের মূলধারা থেকে আলাদা।
অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো নিজ থেকেই নির্বাসিত জীবন-যাপন করছেন।
জনাব , শাহ আহমদ রেজা ১৯৭১ সালে প্রকাশিত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে ‘যুগে যুগে মওলানা ভাসানীর সংগ্রাম’ বইতে লিখেছেন, "পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতা হরে কৃষ্ণ কোঙার ১৪ই মে অভিযোগ করেছিলেন যে, 'মওলানা ভাসানীকে কলকাতাতেই কোথাও অন্তরীণ রাখা হয়েছে'।"
জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "মওলানা ভাসানী কোথায় আছে সেটা তিনি বা তার সরকার জানেন না।"
সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ (প্রয়াত) তার 'মধ্যরাতের অশ্বারোহী' বইতে লিখেছেন, “তিনি যদি ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত না নিতেন, তবে হয়তো তার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো।
ফয়েজ আহমদ লিখেছেন, "ভারতে থাকার সময় মওলানা ভাসানীর গতিবিধি ছিল সবসময় নিয়ন্ত্রিত। কেবলমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের সাথে তিনি ঘুরতে পারতেন।"
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর হবার আগে মওলানা ভাসানী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে লন্ডনে বিপ্লবী অস্থায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সে লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের আটই এপ্রিল লন্ডনের পথে আত্মগোপন করে ভারতের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
ফয়েজ আহমদ লিখেছেন, “ভারত থেকে লন্ডনে পৌঁছানোর জন্য সহজ পথ বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল ভ্রান্ত। এই রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই তিনি ভারত সরকার কর্তৃক অঘোষিত গৃহবন্দী হয়ে পড়েন।
এবং তার বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনাটি স্বাভাবিকভাবেই বানচাল হয়ে যায়। জীবনে তার সবচাইতে বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল এই ব্যর্থতা।”
সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ লিখেছেন, ‘’ভারতে অবস্থানকালে কোন এক সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর বৈঠক হয়েছিল।’’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিচালনার জন্য পঞ্চদলীয় একটা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির বৈঠকে তিনি একবার যোগ দিয়েছিলেন। সেই বৈঠকের একটি ছবি তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
মওলানা ভাসানীর অনুসারীরা তাদের বিভিন্ন লেখায় লিখেছেন,
এর মাধ্যমে ভারত সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, মওলানা ভাসানী ভারতে ভালো আছেন, সুস্থ আছেন এবং তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
তবে ফয়েজ আহমদের ভাষা য়, যেদিন বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে, সেই ১৬ই ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী ভারতের দেরাদুরে অঘোষিত গৃহবন্দী হিসাবে অবস্থান করছিলেন।
আরও পড়ুন:
ভারত কেন মরিয়া হয়ে উঠেছে? ড. ইউনূস যেভাবে ভারতকে চাপে ফেলে দিচ্ছে।
কম খরচে বিমানের টিকিট কাটার ৫ কৌশল জানুন


0 Comments